প্লেটোর রহস্যময় পাবলিক লেকচার, অ্যাকাডেমিক কালচারের বৈশিষ্ট্য আর বাংলাদেশে বিদ্যমান সার্টিফিকেট ফেটিশিজমের সমস্যা

দার্শনিক প্লেটো তার পৈতৃক সম্পত্তিতে প্রতিষ্ঠিত আর গ্রীক বীর অ্যাকাডেমাসকে উৎসর্গকৃত জমিতে জলপাই গাছের তলায় নিজের ছাত্রদের উদ্দেশ্যে লেকচার দিতেন, এই অ্যাকাডেমাস নাম থেকেই অ্যাকাডেমিয়া শব্দের উৎপত্তি। এখন প্লেটো তার জীবনে শুধুমাত্র একটা লেকচারই পাবলিক অডিয়েন্সের সামনে দিয়েছিলেন, কিন্তু এই লেকচারটাই সম্বন্ধে আমরা সরাসরি কিছু জানতে পারি না। তার ছাত্র অ্যারিস্টটলের ছাত্র অ্যারিস্টোজেনাসের বই হারমোনিকসে এই লেকচারের একটা বিবরণ উঠে এসেছে। কিন্তু এই লেকচারটা এতটাই অদ্ভুত আর রহস্যময় ছিলো যে এই লেকচারটাকে গ্রীক দর্শনের ইতিহাসের অন্যতম ধাঁধাঁ হিসাবে বিবেচনা করা হয়।



এই লেকচারটার শিরোনাম ছিলো "Lecture on good"যতটুকু জানা যায় এই লেকচারের ব্যাপারে বেশ ভালো রকমের প্রচারণা চালানো হয়েছিলো আর সর্বস্তরের মানুষ এতে অংশগ্রহণ করছিলো। অংশগ্রহণকারী জনতার একটা ধারণা ছিলো যে এই লেকচারে অংশগ্রহণ করলে "ভালো বলতে কি বোঝায়" এইটা সম্পর্কে জানতে পারবে আর এই জ্ঞান তাদের জীবন যাপনে সাহায্য করবে। কিন্তু বেরসিক প্লেটো এই লেকচারে আলোচনা শুরু করলো জ্যামিতি নিয়া, তার সাথে জোড়া দিলো অ্যাস্ট্রোনমি, মিউজিক থিওরি আর নাম্বার থিওরি, আর শেষে বললো "একত্বের দর্শনই উত্তম" এই টাইপের অ্যাবস্ট্রাক্ট কথা। স্বাভাবিকভাবেই এই লেকচার শুইনা আম আদমিরা খেপলো, কেউ কেউ চুপচাপ লেকচার গ্যালারি থেকে বের হইলো আর কেউ কেউ গালি দিলো। এই লেকচার থেকেই অ্যারিস্টটল শিক্ষা নিছিলো যে কোন বিষয় সম্পর্কে বলতে গেলে আগে কি বিষয় নিয়ে বলতেছে ওইটা পাবলিকরে বুঝায় নিতে হয়। 😅



যাই হোক, গ্রীক দর্শনের ইতিহাসে বড় ধরণের একটা ধাঁধাঁ হইলো প্লেটো এইরকম অ্যাবস্ট্রাক্ট একটা ব্যাপার নিয়ে এইরকম পাব্লিক পরিসরে লেকচার দিছিলো কেন। এই নিয়ে বেশ ভালো রকমের ডিবেট আছে, সেইটাতে যাচ্ছি না, আমি মূলত জার্মানির Tubingen university এর গ্রীক ফিলোসফির স্কলার Konrad Gaiser এর মত উল্লেখ করতেছি-



ব্যাপারটা হচ্ছে প্লেটোর শিক্ষক সক্রেটিসকে এথেন্সের পলিটিকাল বডিই মৃত্যুদন্ড দিছিলো, এই বিবেচনায় প্লেটোর সাথে এথেনিয় পলিটির সম্পর্ক ছিলো সবসময়েই টেন্স। এর উপর প্লেটোর অ্যাকাডেমির উপর এথেনীয় ডেমোক্রেসির উলটা অভিজাত তন্ত্র চর্চার অভিযোগ ছিলো, ওই সময়কার বিভিন্ন কমেডি লেখক প্লেটো আর তার স্কুলের ছাত্রদের নিয়ে হাসি তামাশা করতো। এছাড়া এথেন্স নিবাসীরা বেশ সীমাবদ্ধ ক্ষেত্রে হইলেও ডেমোক্রেসির চর্চা তাদের নগর রাষ্ট্রে করতো, এবং তারা যেকোন ধরণের আবদ্ধ এলিটিজমের চর্চাকে সন্দেহের চোখে দেখতো। প্লেটোর জীবদ্দশাতেই পিথাগোরাসের কাল্ট বিভিন্ন আক্রমণের শিকার হয়। এর সাথে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হিসাবে প্লেটোর একজন ছাত্র Dion সিরাকুজে প্লেটোর রিপাবলিকের আদলে রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করে। তো সব মিলিয়ে প্লেটোর আর তার একাডেমির উপর এলিটিজম চর্চার একটা অভিযগ সবসময়ই ছিলো।



এখন কনরাড গাইজারের মতে এই এলিটিজমের অভিযোগকে দূর করার জন্যই প্লেটো মূলত এই পাবলিক লেকচারের আয়োজন করেন। প্লেটোর এই লেকচারের আয়োজনের উদ্দেশ্য ছিলো দুইটা- প্রথমত প্রমাণ করা যে তার অ্যাকাডেমি আসলে এলিট বা ডেমোক্রেসি বিরোধি কোন প্রতিষ্ঠান না, এই লেকচারগুলাকে পাবলিকলি দিলেও কোন ক্ষতি নাই, দ্বিতীয়ত, প্লেটোর একাডেমির যে এলিট একটা স্ট্রাকচার তৈরি হইছে তা মূলত এর সাবজেক্ট ম্যাটারের কারণে। সাধারণ মানুষের আসলে এইসবে আগ্রহ নাই, তাদেরকে এই লেকচারগুলা ফ্রিতে দিলেও তারা এইগুলাতে উপস্থিত হবে না। এই অ্যাবস্ট্রাক্ট থিওরেটিকাল ইস্যুতে আসলে খুব কম মানুষেরই আগ্রহ কাজ করে আর যাদের কাজ করে তারাই অ্যাকাডেমিতে আসে।



এখন যদি বাস্তব ইতিহাসের প্রমাণ দেখি প্লেটোর অ্যাকাডেমিতে আসলেই অন্তত এথেন্সের পলিটির তুলনায় বেশি গণতন্ত্রের চর্চা ছিলো। প্লেটোর সরাসরি বেশ কয়েকজন ছাত্র পাওয়া যায় যারা অ্যাকাডেমিতে থাকা অবস্থাতেই প্লেটোর দর্শনের বিপরীতে লেখালেখি করেছেন। এমন কি প্লেটোর যে ফর্মের আইডিয়া সেই আইডিয়াকে নিগেট করছিলো দার্শনিক স্পুসিপাস যাকে প্লেটো নিজেই তার মৃত্যুর পর একাডেমিয়ার দায়িত্ব দিয়ে গিয়েছিলেন। এছাড়াও, অ্যাকাডেমির দুই জন নারী শিক্ষার্থীর কথাও আমরা জানতে পারি বিভিন্ন সূত্রমতে।



এখন এতক্ষণ ধান ভানতে প্লেটোর গীত গাচ্ছিলাম মেইনলি একটা জিনিস পয়েন্ট আউট করতে যে একটা আদর্শ অ্যাকাডেমিয়ার পরিবেশ কিন্তু এমনটাই হয়। প্লেটোর অ্যাকাডেমিতে প্লেটো গণিত বা দর্শনের বিভিন্ন টপিকে নিজের মত আলোচনা করতো, এই আলোচনার ভিত্তিতে প্লেটোর শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তরের অনুসন্ধান করতো। মানে প্লেটোর মূল ভূমিকা ছিলো বলা যায় জ্ঞান অর্জনের উসকানি দেওয়া, আর মেথড হিসাবে যেন বুদ্ধিবৃত্তির চর্চা বজায় থাকে সেটাকে নিশ্চিত করা (যেমন, প্লেটোর দুইজন শিক্ষার্থী একটা জ্যামিতির সমস্যা উপপাদ্য প্রয়োগ না করে মেকানিকালি মাপজোক করে সমাধান করতে চাওয়ায় প্লেটো তাদের ভর্তসনা করেছিলো জানা যায়)।



বিয়ে আর চাকরির ক্ষেত্রে মাস্টার্স করা বাধ্যতামূলক করার ফলে আমাদের হায়ার স্টাডিজ দাড়াইছে প্লেটোর অ্যাকাডেমির সিস্টেমের এক্সাক্ট অপোজিট। দেখেন অ্যাকাডেমিক চর্চার বিষয়টা একটা কলিং এর ব্যাপার, ভিতর থেকে এই জীবনের ব্যাপারে একটা আগ্রহ একটা ইচ্ছা থাকতে হয়। জীবনের আর জগতের বিভিন্ন প্রশ্ন নিয়ে চিন্তা করার ইচ্ছা আর আগ্রহ আর প্রশ্নের উত্তর খোজার জন্য ডিসিপ্লিন মেনে চলার জন্য ইনার ড্রাইভ কাজ করতে হয়। এই জিনিস বাধ্যতামূলকভাবে করানো যায় না। করাইতে গেলে থ্রি ইডিয়টসের আমির খান বর্ণিত লতা মুংগেশকরকে দিয়ে ফাস্ট বোলিং করানো আর শচীন টেন্ডুলকারকে দিয়ে গান গাওয়ানোর মত সিচুয়েশনের উদ্ভব হয়।



ধরা যাক, বাংলাদেশে এখন মাধ্যমিক লেভেলে সবার জন্য ক্রিকেট খেলা বাধ্যতামূলক করে দেওয়া হইলো আর ক্রিকেট খেলার উপর নাম্বারিং করা হইলো, এতে কি দেশের ক্রিকেট খেলার মান উন্নত হবে? নাকি যাদের আসলেই ক্রিকেট খেলার আগ্রহ আছে তাদেরকে খেলার সুযোগ করে তাদের উপর রিসোর্স বিনিয়োগ করে উন্নতি আসার সম্ভাবনা বেশি? এলিটিজমের বিপরীত হিসাবে "বাধ্যতামূলক উচ্চশিক্ষা"র দর্শন প্রতিষ্ঠা করে হায়ার থিওরেটিকাল প্রশ্নগুলা নিয়ে অনাগ্রহী ছেলেপেলেদের থিওরেটিকাল সাবজেক্টে ভর্তি করার কোন সুফল কি দেশ আজতক পাইছে? এই Faux egalitarianism বা ভুয়া সাম্যবাদ কি আদৌ কোন ফল দিতে পারছে?



বরং আমার মতে পুরা প্রাথমিক আর মাধ্যমিক শিক্ষাটাকে এমনভাবে সাজানো উচিৎ যাতে শিশুদের প্রাইমারি কলিং তাদের কোন লাইনে বিকশিত হওয়ার ইচ্ছা সেটা তারা নিজেরা বুঝতে পারে। সেই কলিং অনুসারে তাদেরকে বিকাশের পথ করে দেওয়াটাই রাষ্ট্রের দায়িত্ব। হরে দরে সার্টিফিকেট বিতরণ করে মধ্যবিত্তের উচ্চ শিক্ষার ফেটিশিজম পূরণ করা কোন রাষ্ট্রের শিক্ষা ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য হইতে পারে না।

Comments

Popular posts from this blog

সংস্কৃতির বিকাশ ও মানবিক অনন্যতার উদযাপন

Ondine's curse আর মাথা নষ্টের আলাপ