Ondine's curse আর মাথা নষ্টের আলাপ

  গ্রীক মিথোলজিতে একটা টার্ম আছে- ondine's curse, সেখানে অনডাইন নামের এক নিম্ফ এক মানুষের সাথে বিয়ে করার জন্য নিজের নিম্ফ বা জলপরীর সত্ত্বা বিসর্জন দিয়ে মানুষ হয়ে যায়। কিন্তু এক সময় দেখে তার প্রিয় মানুষটাই আরেক মেয়ের সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে গেছে। তখন ওই নিম্ফ অনডাইন তার স্বামীকে অভিশাপ দেয় যে আমাদের সাধারণ মানুষদের শ্বাস নেওয়ার কাজটা যেরকম অচেতন অটোনমিক বা নিজে নিজে তৈরি সিস্টেমে চলে তেমনটা আর হবে না। তার অভিশপ্ত স্বামীকে এখন থেকে প্রতিটা শ্বাস সচেতন সিস্টেমে, বুঝে বুঝে নিতে হবে- তার জীবনে কোন ঘুম আর সুকুন থাকবে না, ২৪ ঘন্টার সচেতনতার জীবন হবে তার।

ভয়াবহ এক অভিশাপ। মেডিকেল সায়েন্সের খুব ভয়াবহ একটা রোগ- central hypoventilation system কে এই ভয়াবহ অভিশাপের সাথে তুলনা দেওয়া হয়। ব্রেইনে এনসেফালাইটিস, টিউমার বা অন্য কিছু কারণে খুব রেয়ারলি এই সমস্যাটা হয়। ব্রেইনের অটোমেটিক শ্বাস নেওয়ার ক্ষমতা চলে যায়, নিজে নিজে বুক ফুলিয়ে শ্বাস নেওয়ার মত শ্বাস নিতে হয়। আর সেটা যেহেতু সবসময় সম্ভব হয় না তাই তাদেরকে আল্টিমেটলি লাংস এর নিজস্ব সমস্যা ছাড়াই মেকানিকাল ভেন্টিলেশন সিস্টেমে।
এই "সার্বক্ষণিক সচেতনতা" এক ধরণের কার্সের মতই। এই সার্বক্ষণিক বা সচেতনতা "হাইটেনড সেন্স অফ অ্যাওয়ারনেস" কিভাবে রিয়েল যুদ্ধে অস্ত্র বানানো হইছিলো সেই কাহিনীটা বলি-
স্প্যানিশ সিভিল ওয়ারের সময় ফ্রেঞ্চ আর্টিস্ট আর ডিজাইনার আলফোনস লরেনকিক সিভিল ওয়ারের রিপাবলিকান আর অ্যানার্কিস্ট সাইডে যোগ দেন। তার কাজ ছিলো ফ্র্যাংকোপন্থী ফ্যাসিস্টদের বন্দী করার জন্য জেলের ডিজাইন বানানো। লরেনকিক জার্মানির মডার্নিস্ট বাউহাউজ স্কুলের আর্কিটেকচারের কাজ দ্বারা অনেক ইনফ্লুয়েন্সড ছিলেন, এবং মডার্নিস্ট আর্টের ডিজোনেন্স থিওরি উনি ব্যবহার করেন জেল বা টর্চার রুম তৈরি করতে। (টর্চার রুমের একটা স্যাম্পলের ছবি স্ট্যাটাসের প্রথম কমেন্টে দিলাম)।
ডিজোনেন্স হচ্ছে হারমোনি বা মিলের উলটা, প্যাটার্নড সিস্টেমের অপোজিট। মানে আপনার যে জানা শোনা বোঝার দুনিয়াকে ডিকনস্ট্রাক্ট করার একটা টেকনিক।
এই টর্চার চেম্বার ডিজাইন করতে লরেনকিক দেওয়ালের রঙ দেন রাশিয়ান পেইন্টার ভাসিলি ক্ল্যান্ডিনস্কির মডার্ন রঙ এর সন্নিবেশের আকারে। চেনাজানা সব রঙের ক্যাওটিক মিশ্রণ ছিলো দেওয়ালে। রুমের সাইজ ছিলো ৩ ফুট বাই ৬ ফুট। রুমে শোয়ার জায়গাটা এক্সাক্টলি ২০ ডিগ্রী কাত করে হেলানো যাতে আপনি শোয়ার "চেষ্টা" করতে পারবেন, ১০ মিনিটের মত ধরে শুইতেও পারবেন তারপর স্লাইড করে পড়ে যাবেন। রুমের ফ্লোরে ইট আন অর্গানাইজড ভাবে রাখা যাতে আপনি সরাসরি সামনাসামনি হাটতে না পারেন।
মানে সহজ ভাষায় কোন ভায়োলেন্ট টর্চার নাই, আপনার শরীরের উপর আঘাত বা মারের দাগ নাই, কিন্তু আপনার ইনার ওয়ার্ল্ড, আপনার ব্রেইন, আপনার সেন্স মেকিং অর্গানটা এই আর্কিটেকচারের চাপেই জেলি হয়ে যাবে।
এই আর্কিটেকচারের মূল কাজ হচ্ছে আপনার ২৪ ঘন্টার জীবনটাকেই একটা সচেতন ক্রিটিকাল থিংকিং এর প্র্যাক্টিসে পরিণত করবে। আপনার জীবন থেকে সকল প্রকারের পরিচিত ল্যান্ডস্কেপ সে ছিনায় নিবে। আপনার জীবনের প্রতিটা মুহূর্তকে পরিণত করবে একধরণের সচেতন "ইন্টারপ্রেটিভ লেবার" এর অংশ হিসাবে- এইটাই এই টর্চার সেলগুলার ফিলোসফি।
ইন্টারপ্রেটিভ লেবার শব্দটা অ্যান্থ্রোপলজিস্ট ডেভিড গ্রেবারের কাছ থেকে ধার করা। বাংলায় এর অনুবাদ করলে "তর্জমামূলক শ্রম" বলা যাইতে পারে। গ্রেবারের মতে মানুষের জীবনের বন্দী জীবনের একটা আসপেক্ট হচ্ছে এই তর্জমামূলক শ্রমের বন্দিত্ব। যেমন, বাসার দায়িত্বশীল মেয়েদের উদাহরণ হিসাবে গ্রেবার দেখাইছেন- পুরুষতান্ত্রিক সিস্টেমে মেয়েরা একধরণের বাধ্যতামূলক ইন্টারপ্রেটিভ লেবারের আওতায় আটকা পড়েন। তাকে সবসময় বাসার পুরুষ সদস্যদের মুড বা চাহিদার হিসাব নিকাশ করে চলতে হয়, তারা কোন মুহূর্তে কি চাচ্ছে কি চিন্তা করছে এই চাপানো হিসাব নিকাশ তাকে করে যেতে হবে। আধুনিক হোয়াইট কলার ওয়ার্কপ্লেসগুলাও একধরণের ইন্টারপ্রেটিভ লেবার তার কর্মীদের চাপায় দেয় যেখানে একজন নিম্নপদস্থ কর্মীকে সবসময় তার উপরওয়ালাদের এমনকী নিজের কলিগদের মধ্যেও ডমিন্যান্টদের চিন্তাভাবনা ইচ্ছা অনিচ্ছা ইন্টারপ্রেট করে চলতে হয়। অ্যাপলের সিরিজ সেভারেন্সে এই জিনিসটা খুব চমৎকারভাবে আছে।
অ্যাকাডেমিয়ার নিরাপদ পরিবেশে সীমিত একটা সময়ের জন্য ক্রিটিকাল থিংকিং আর ইন্টারপ্রিটেশন একটা চমৎকার জিনিস, কিন্তু এই একই জিনিস যখন সিস্টেমিক প্রেশারের মাধ্যমে ২৪ ঘন্টার অস্তিত্বের সাথে জড়িত হয়ে যায় এইটা নিজেই একধরণের টর্চারে পরিণত হয়।
বাংলাদেশের নয়া বুদ্ধিজীবিতার নামে একধরণের "সেলিব্রেশন অফ আনরিজন" এই ধরণের ক্রাইসিস তৈরি করছে বাংলাদেশের ইন্টেলেকচুয়াল স্ফিয়ারে আমার মনে হয়। রিসেন্টলি নয়া বন্দোবস্তীয় বুদ্ধিজীবিদের ক্রিটিকাল তত্ত্ব চর্চার কিছু সুপারফিশিয়াল টার্মকে একেবারে কাঁচা রাজনীতির অংশে পরিণত করায় এবং রাজনৈতিক এই আলাপগুলা একদম সিভিল এক্সিস্টেন্সের দাথে জড়িত হওয়ায় এই "হাইটেন্ড সেন্স অফ অ্যাওয়ারনেস" একটা সামগ্রিক ডিজিনেস, মাথা ঘুরাল্টি মারার ফিলিংস তৈরি করতেছে, অন্তত আমার নিজের কাছেই এমন ফিল হচ্ছে কয়েক মাস ধরে।
যখন এই আলাপগুলা পড়ি যে- নেপালের মত আরো বেশি মব আর জ্বালাও পোড়াও করলে দেশের আরো ভালো হইতো, ওয়েস্টিনে গিয়ে দলীয় নেতারা খাওয়া দাওয়া করলে বড়লোকদের হাত থেকে রাজনীতি গরিবের হাতে চলে আসবে, মাজারকে নিষিদ্ধ করতে হবে "এপিস্টেমিক রেসপন্সিবিলিটি"র কারণে- এবং এইরকম আরো অন্য পোস্ট-ট্রুথের আলাপগুলাকে ইন্টেলেকচুয়ালি সেলিব্রেটেড হইতে দেখি তখন রিঅ্যাক্টিভলিই একধরণের হাইপার-ক্রিটিকাল অ্যাওয়েরনেস তৈরি হচ্ছে। এর সাথে যুক্ত হইছে ইন্টেরিম সরকারের নানারকমের সাররিয়েল অর্থহীন অ্যাক্টিভিটি- সিস্টেমিক রিফর্ম বা আওয়ামীলীগের বিচার বাস দিয়ে সেন্টমার্টিনের লাল কাকড়া সংরক্ষণ বা ভারতে ইলিশ রপ্তানি ইস্যু, মহেশখালিকে সিঙ্গাপুর বা চিটাগাং পোর্ট নিয়ে নাচানাচি। আর লাস্টলি আসছে কোল্ডওয়ারের সিআইএ কেজিবি স্টাইলের কনভেনশনাল পলিটিক্স- নানারকমের গুপ্ত অ্যাসোসিয়েশন, নিজের পার্টি বানায়ে আরেক পার্টিকে জিতানোর রাজনীতির নামে অদ্ভূত চালিয়াতি আর কৌশল-সব মিলে অবস্থা এমন দাড়াইছে যে নিজেকেই এখন লরেনকিকের জেলের বাসিন্দা মনে হয়, মনে হয় আমাদের উপর নিম্ফ অনডাইনের অভিশাপ বর্ষিত হইছে, প্রতি মুহূর্তে সচেতনভাবে নতুন রকমের পজিশনালিটি ইন্টারপ্রেট করতে হচ্ছে নতুন ক্ষমতার বিন্যাস নতুনভাবে প্রকাশ পাচ্ছে এবং এই ওভার ইন্টারপ্রিটেশনের প্র্যাক্টিসের চাপে পুরা পলিটিকাল ল্যান্ডস্কেপ থেকেই সেন্স নামক জিনিসটা হারায় গেছে-
আমাদের একটা বড় অংশের সেন্স মেকিং পুরা সিস্টেম কলাপ্স হয়ে যাওয়ার কথা আমার মনে হয়।
এই কলাপ্সই বেসিক্যালি রাজনীতি বিষয়ে নতুন অ্যাপাথি, নতুন বিরাজনীতিকরণের সূত্রপাত করতেছে আর করবে বল্ব আমার ধারণা। আর জার্মানির উনবিংশ শতকের ভাইমার আমলে যা দেখছি এই কলাপ্সড সেন্স মেকিং এর ফলে সৃষ্ট বিরাজনীতিকৃত পরিবেশই ফার রাইট পলিটিক্সের উর্বরভূমি হিসাবে কাজ করে আসছে। যখন সেন্স তৈরির সব সিস্টেম কলাপ্স করে যাবে তখন ট্র্যাডিশনের ধ্বজাধারী ফার রাইটরা কনজার্ভেটিভ পলিটিক্সের নস্টালজিয়া নিয়ে মানুষজনের ঘরে ঘরে হাজির হবে এই কনফিউজড স্টেট থেকে মুক্তি দেওয়ার জন্য।

Comments

Popular posts from this blog

প্লেটোর রহস্যময় পাবলিক লেকচার, অ্যাকাডেমিক কালচারের বৈশিষ্ট্য আর বাংলাদেশে বিদ্যমান সার্টিফিকেট ফেটিশিজমের সমস্যা

সংস্কৃতির বিকাশ ও মানবিক অনন্যতার উদযাপন