সংস্কৃতির বিকাশ ও মানবিক অনন্যতার উদযাপন

এক ছোট ভাইয়ের সাথে কথা বলতেছিলাম বাংলাদেশের বিজ্ঞান শিক্ষা চিন্তার বিকাশ নিয়ে, সে তখন একটা চমৎকার প্রশ্ন করছিলো- "ভাই আমরা এই কোনার একটা দেশে বইসা বিজ্ঞান টিজ্ঞান নিয়া গবেষণা কইরা কি করমু, আমেরিকা, রাশিয়া, জার্মানি, চায়না জাপান ওরা তো গবেষণা করতেছে, ওরা আবিষ্কার করুক আমরা পয়সা দিয়া ওইসব আবিষ্কার কিনা নিয়া আসমু। 😎" করোনার ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রেই এইটা প্রমাণিত হইলো, এতো পয়সা দিয়া গবেষণা, চিন্তাভাবনা কইরা কি লাভ, পয়সা দিয়ে তো কিনেই আনতেছি।


এই প্রশ্নটাকে আরো বিস্তৃত করা যায়। বাংলাদেশে সাহিত্য, কবিতা দর্শন চর্চা কইরাও আসলে কি লাভ? বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এইসব চর্চা তো হচ্ছে, আর এইগুলা ইংরেজিতেও অনুবাদ করা হচ্ছে, আমরা খালি ইংরেজিটা ভালো মত শিখলেই তো চলে। (এই দাবী নিয়ে বইমেলার জন্য আস্ত বইও অলরেডি লিখে ফেলা হইছে)। ব্যাপারটা হচ্ছে, "কেন করা উচিৎ" এই প্রশ্নের উত্তর তো "বোইজ্ঞানিক" উপায়ে দেওয়া সম্ভব না। বিজ্ঞান তো "is" বা কি হয় হচ্ছে এইটাকে খুঁজতে পারে, কিন্তু কি হওয়া উচিৎ বা Ought নিয়ে সে থাকে নিশ্চুপ। কি করা উচিৎ এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গেলে আপনাকে সবসময়ই কোন না কোন প্রকারের ভ্যালু সিস্টেমের ধর্না দিতে হবে।

যাই হোক, আমি যতটুকু বুঝি, আমার ভ্যালু সিস্টেম যেটা বুঝে- একটা প্যারাসাইটের মত বিশ্বসভ্যতার সকল অর্জন নির্লিপ্তভাগে ভগ করা কোন জাতির অস্তিত্বের মূল উদ্দেশ্য হইতেপ পারে না। বরং নিজের সাধ্যমত নিজের অবস্থান অনুসারে অবদান রাখাটাই জাতির মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিৎ। কিন্তু কথা হচ্ছে এই জিনিসে আস্থা রাখতে গেলে তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটা কথা এসে পড়ে- সেটা হচ্ছে পৃথিবীর প্রতিটা জাতিই unique, আবার এই জাতির যে কনস্টিটিউটিং এলিমেন্ট মানুষ তারাও ইউনিক, এই মানবজীবন ইন ইটসেলফ একটা মূল্যবান জিনিস।

এই যে মানুষকে মানবজাতিকে একটা ইউনিক ফেনোমেনন হিসাবে ভাবতে শেখা এইটাই যেকোন সংস্কৃতির বিকাশের কোর আইডিওলজি। আমাকে যদি সংস্কৃতির বিকাশের একটা সহজ সংজ্ঞা বলতে বলা হয় আমি এক কথায় বলবো- "Celebration of uniqueness of human existence" "মানবিক অস্তিত্বের অনন্যতার উদযাপন" এই জিনিসের চর্চা, এই জিনিসে বিশ্বাস যেখানে নাই সেখানে সংস্কৃতির বিকাশও নাই। এখন এইখানে দুইটা ইস্যু বোঝা গুরুত্বপূর্ণ- ১। মানুষের অনন্যতা আর ২। তার উদযাপন। এই দুইটাকে কিছুটা ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন।

আপনি গ্রীক স্থাপত্যকলা বা তাদের দর্শনের দিকে তাকান মানবিক অনুভূতিকে কিভাবে মহাজাগতিক শৃঙ্খলার সাথে দেখার প্রয়াস সেখানে পাবেন। রোমান সাহিত্য আর দর্শনের দিকে তাকান সেইখানেও আছে মুক্তিপ্রাপ্ত দাস টেরেনশিয়াসের সেই বানী- "nothing human is foreign to me". রেনেসাঁর ম্যানিফেস্টো দেখেন পিকো মিরান্ডোলার সেই বিখ্যাত ডায়লগ- On dignity of human beings. এইভাবে এনলাইটেনমেন্ট, ভারতীয় দর্শন, মধ্যযুগের মুসলিম ধর্মতাত্ত্বিক দর্শন সবখানেই একটা কথা- মানুষের আর মানবিক জীবনের অনন্যতা। এমনকি পোস্টমডার্ন যুগের নৈরাশ্যবাদী নিহিলিস্ট দর্শনেও আদতে মানুষের জীবনের অস্তিত্বের অর্থহীনতা নিয়ে আলোচনা, মানে শেষ মেশ ফোকাস এই মানুষেই।

কিন্তু এর সাথে আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ এলিমেন্ট আছে, সেটা হচ্ছে এই মানুষের অনন্যতার উদযাপন বা যেটাকে আমি বলছি- "Celebration of uniqueness of human existence" এখন এই উদযাপন এককভাবে করা যায় না, উদযাপন মানেই একটা কালেক্টিভ এফোর্ট। এই কারণে সংস্কৃতির বিকাশ কখনোই শুধুমাত্র ক্লোজড ডোরে উপরতালার বিষয় নয়, সমাজের একটা সিগনিফিকেন্ট অংশকে তার সাথে যুক্ত করতে হয়। যেমন ধরা যাক জার্মানির নাজি আর ইতালির ফ্যাসিস্ট রিজিমের কথা। এই দুইটা রিজিমের মত সংস্কৃতির চর্চা নিয়ে অবসেসড রিজিম আর পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ, স্কুলে হাই স্কুলে মোজার্ট বাখ কান্টের দর্শনের চর্চা, কিন্তু তারপরেও তাদের রিজিমের আর্টের উৎপাদন পর্বতের মুষিক প্রসবও না।

এর কারণ হচ্ছে মানুষের অনন্যতার ব্যাপারটা শুধু মাত্র নাচ গান শিল্পকলাতে সীমাবদ্ধ থাকলে সেটা শুধুমাত্র প্রিভিলেজড ক্লাসের খায়েশ মেটানোর বস্তুতেই সীমাবদ্ধ থাকে। সাধারণ জনগণকে যদি এই উদযাপনে অংশ নেওয়াতে হয় তাহলে আপনার গোটা রাষ্ট্রকেই উদযাপনের ক্ষেত্র বানাতে হবে। গোটা রাষ্ট্রকাঠামোতে "মানুষের অনন্যতা"র দর্শনের ছোয়া থাকতে হবে। আইন কানুন অর্থনীতি সবকিছুকেই মানবিক দর্শনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। রাষ্ট্র হচ্ছে মানুষের তৈরি সেই সাংস্কৃতিক উপাদান যেখানে সর্বোচ্চ সংখ্যক মানুষ অস্তিত্বের প্রয়োজনেই অংশগ্রহণ করে। এই রাষ্ট্র যখন তাকে তার মানবিক সৌন্দর্য মানবিক সম্মানকে মর্যাদা দিবে, যখন জীবনকে সুন্দর করার উপাদানের সাথে ব্যক্তিকে পরিচয় করিয়ে দিবে তখন ব্যক্তি নিজ উদ্যোগেই মানুষের অনন্যতার উদযাপনে অংশ নিবে। সেটাই প্রকৃত সংস্কৃতির বিকাশ। ব্রিটিশ আর্ট হিস্টোরিয়ান হার্বার্ট রিড যেটা বলেছেন- ‘Spiritual activity works only in the plenitude of freedom" স্বাধীনতার প্রাচুর্য্যেই আত্মিক কার্যাবলি ক্রিয়া করে।

Comments

Popular posts from this blog

প্লেটোর রহস্যময় পাবলিক লেকচার, অ্যাকাডেমিক কালচারের বৈশিষ্ট্য আর বাংলাদেশে বিদ্যমান সার্টিফিকেট ফেটিশিজমের সমস্যা

Ondine's curse আর মাথা নষ্টের আলাপ